একজন মুহিত এবং নৈতিক মানুষ হওয়ার গল্প

‘হেডলাইটের আলোতে সামিটের উদ্দেশে যখন যাত্রা শুরু করি, তখন তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের নিচে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাত যত বাড়তে থাকে, তাপমাত্রা তত কমতে থাকে। রাতের অন্ধকারে পর্বতারোহীদের মাথায় লাগানো লাইটগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, এভারেস্টের গায়ে সারি বেঁধে জোনাকি উড়ছে।’

আহ্ছানিয়া মিশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছে এভারেস্ট জয়ের গল্প শুনাচ্ছিলেন দুইবার এভারেস্ট-জয়ী একমাত্র বাঙালি এম এ মুহিত।

গল্পের আদলে বক্তব্য শুরু করেন মুহিত। শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণে বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়নি তার।

অনুষ্ঠানটি ছিল এথিকস এডুকেশন ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (E2SD)-এর ‘নৈতিক শিক্ষা ওয়ার্কবুক’ বিতরণ উপলক্ষে।

এরপর মুহিত বললেন, ‘রাত ১২টার দিকে প্রায় ২৮ হাজার ১১০ ফুট উচ্চতায় ফার্স্ট-স্টেপ নামক ভয়ঙ্কর এক জায়গায় পৌঁছাই। ফার্স্ট-স্টেপ পার হয়ে হেডলাইটের আলোতে প্রথম এভারেস্টের গায়ে পড়ে থাকা মৃতদেহ দেখতে পাই।’

কেউ একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘মৃতদেহ?’

‘হ্যাঁ, মৃতদেহ। আরোহণের সময় কেউ মারা পড়লে হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় মৃতদেহে পচন ধরে না। মনে হয়, এ-ই বুঝি মারা গেল।’

মুহিত বললেন, ‘রাত একটার দিকে ‘মাশরুম-রক’-এর কাছে আমার প্রথম অক্সিজেন সিলিন্ডার পরিবর্তন করা হয়। মাশরুম রক থেকেই প্রথম বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ মাকালু দেখতে পাই। তখন আকাশে বেশ বড় একটি চাঁদ ছিল। চাঁদের আলোয় মাকালুকে ভয়ঙ্কর সুন্দর লাগছিল।’

শিক্ষার্থীরা তখন গল্পের ভেতর ঢুকে পড়েছে। সামনে মুহিত, চোখ বন্ধ করলে ভয়ঙ্কর এভারেস্ট!

মুহিত বললেন, ‘রাত তিনটার দিকে প্রায় ২৮ হাজার ২৫০ ফুট উচ্চতায় ‘সেকেন্ড-স্টেপ’ নামের দ্বিতীয় বাধার কাছে এসে পৌঁছি। সেকেন্ড-স্টেপ পার হওয়ার পর শেরপা গাইড পেম্বা দর্জির হাতের বিশেষ ঘড়িতে দেখলাম, তাপমাত্রা তখন মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখানেও কয়েকটা মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখি।’

ভয়ে আঁৎকে ওঠার মতো গল্প। শিক্ষার্থীরা মুহিতের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।

‘হঠাৎ করে জোরে বাতাস বইতে লাগল। ঠান্ডা বাতাস চোখে লাগা মাত্রই ঝাপসা দেখতে লাগলাম। চোখে ঝাপসা দেখায় কিছুটা ধীরে এগোতে লাগলাম।’

‘তারপর?’, জানতে চাইল শিক্ষার্থীরা।

তিনি বললেন, ‘ভোর ৫টার দিকে আমি যখন প্রায় ২৮ হাজার ৫৭৫ ফুট উঁচুতে তিব্বত দিয়ে এভারেস্টে আরোহণের তৃতীয় বড় বাধা ‘থার্ড-স্টেপে’ পৌঁছাই, তখন কানে এলো কে যেন ‘হেলপ হেলপ’ বলে চিৎকার করছে। আমার ভেতরটা মুচড়ে উঠল। আমি থার্ড-স্টেপের কাছে পৌঁছাতেই দেখলাম, উচ্চতাজনিত অসুস্থতা ও অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে আয়ারল্যান্ডের একজন পর্বতারোহী মারা গেছেন।’

অতিথি ও শিক্ষার্থী- সবার চোখ তখন মুহিতের দিকে।

তিনি জানালেন, ৮ হাজার মিটার উচ্চতা থেকে শুরু হয় ‘ডেথ জোন’।

‘তখন সামনের দিকে তাকাতেই মনে হচ্ছিল, এই তো একেবারে কাছেই চূড়া দেখা যাচ্ছে। এখনই বুঝি চূড়ায় উঠে যাব। কিন্তু না, তখনও আমাকে আরও প্রায় সাড়ে চারশ ফুট উঁচুতে উঠতে হবে। সামনের রাস্তাটা সোজা নয়, একেবেঁকে গেছে।’

‘এরপর এলো মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০১১ সালের ২১ মে নেপাল সময় সকাল ৭টায় আমি এভারেস্টের শীর্ষে উঠে দাড়াই।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই জোরে করতালি দিয়ে এই মাহেন্দ্রক্ষণ উদযাপন করলেন।

মুহিত বলতে থাকলেন, ‘তখন ভাবছিলাম, সত্যিই কি আমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থানে উঠেছি! চূড়ায় উঠে মিংমা চিরিং শেরপা ও দা কিপা শেরপাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কেঁদে ফেলি।’

কিছু শিক্ষার্থীর চোখও তখন মুহিতের চোখের সঙ্গে লাল হয়ে ওঠে।

‘এভারেস্টের চূড়ায় আমি প্রায় ৩০ মিনিট অবস্থান করি। প্রথম ১০ মিনিট অক্সিজেন মাস্ক পরে, তারপর ২০ মিনিট অক্সিজেন মাস্ক ছাড়াই। এভারেস্টের চূড়ায় পা দিয়েই আমার মনে হয়েছে, আমি পৃথিবীর রাজা এবং প্রিয় বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থানে। এভারেস্ট চূড়ায় দেশের লাল সবুজ পতাকা ওড়াতে পেরে মনে হয়েছে, আমি ষোলো কোটি মানুষকে গর্বিত করতে পেরেছি।’

মুহিত প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কি এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে চাও?’

উত্তরে কেউ কেউ সজোরে ‘হ্যাঁ’ বলল। ভয়ে আড়ষ্ট কেউ বলল, ‘কীভাবে সম্ভব?’

মুহিত বললেন, ‘সম্ভব, অবশ্যই সম্ভব।’

তিনি পরিষ্কার করলেন, ‘এভারেস্ট’ শব্দটা আসলে প্রতীকী। প্রতিটি মানুষই চাইলে এভারেস্টে উঠতে পারেন। মানুষ যখন সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে ভেতরে লালিত স্বপ্নগুলোর সর্বোচ্চ বাস্তব রূপ দিতে পারেন, তখন তিনি এভারেস্ট জয় করেন।’

মুহিত প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কে কী হতে চাও?’

সবাই যার যার স্বপ্নের কথা জানাল। কেউ বলল, ডাক্তার; কেউ বলল, বিজ্ঞানী; কেউ বলল, প্রধানমন্ত্রী।

মুহিত বললেন, ‘প্রত্যেক মানুষের স্বপ্নে একটা এভারেস্ট থাকে। কেউ যদি সেরা ডাক্তার হন, কেউ যদি সেরা বিজ্ঞানী হন, তখন তিনি এভারেস্ট জয় করেন।’

মুহিত ব্যাখ্যা করলেন, ‘কেউ তখনই সেরা ডাক্তার কিংবা সেরা বিজ্ঞানী হন, যখন তিনি সেরা মানুষ হন। মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের একমাত্র পথ হলো নৈতিকতা। নৈতিকতা না থাকলে কেউ কোনো পর্যায়ে সেরা হতে পারেন না।’

তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাইলেন, ‘তোমরা কি নৈতিক মানুষ হতে চাও?’

সবাই সমস্বরে বলল, ‘জি, চাই।’

এরপর অন্য অতিথির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতে ‘নৈতিক শিক্ষা ওয়ার্কবুক’ তুলে দেন এম এ মুহিত, যে বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে নৈতিক মানুষ হওয়ার সবক দেওয়ার চেষ্টা করে E2SD।